রাউজান নিউজ

ষোলআনা ছুঁই ছুঁই সময়ে

ফজলুর রহমান:-

বর্তমান বিশ্বে ৯৫ শতাংশ মানুষ দূষিত, অস্বাস্থ্যকর বাতাস গ্রহণ করছে। ‘অ্যানুয়াল স্টেট অব
গ্লোবাল এয়ার রিপোর্ট’-এর নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এখন বায়ুদূষণ পুরো ষোলআনা ছুঁতে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দূষিত বায়ুর কারণে মানুষ এখন আর ঘরে কিংবা বাইরে কোনোখানেই নিরাপদ নেই।
দূষিত বাতাস গ্রহণের ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ফুসফুস ক্যান্সারসহ দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের সমস্যা হয় এবং প্রচূর অল্পবয়সী মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ঝরে যায় অনেক সম্ভাবনা। ২০১৬ সালে সারা বিশ্বে ৬১ লাখ মানুষ মৃত্যুমুখে পতীত হয়েছে কেবল দূষিত বাতাস গ্রহণের কারণে।

বায়ু দূষণে অসুস্থতার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ। এ তালিকায় প্রথমে আছে উচ্চ রক্তচাপ, দ্বিতীয় স্থানে খাদ্যাভাব। এবং তৃতীয় স্থানে আছে ধূমপান। প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা বিশ্বে যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু বাতাস দূষণের ফলে হয় তার অর্ধেক হয় ভারত এবং চীনে। তবে চীন তাদের দূষণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করছে।
এর আগের বছরের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে বায়ুদূষণ রয়েছে পঞ্চম স্থানে। ২০১৫ সালে প্রায় ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর কারণ এই বায়ুদূষণ। আর এসব অকালমৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঘটেছে চীন ও ভারতে। এসব দেশে প্রতি ১০ জনে মাত্র ১ জন নির্মল বায়ুর এলাকায় বসবাসের সুযোগ পান।

প্রতিবেদন অনুসারে বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে চীনে বছরে ১১ লাখ ৮ হাজার ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় এই সংখ্যা ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০, পাকিস্তানে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১০০ ও যুক্তরাষ্ট্রে ৮৮ হাজার ৪০০।
বিশ্বের অনেক দেশেই বায়ু দূষণ এখন অন্যতম প্রধান পরিবেশগত সমস্যা। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি ৭ জনের একজন শিশু বায়ু দূষণের শিকার! বায়ু দূষণের ভয়াবহতার বাইরে নেই বাংলাদেশও। সংস্থাটি বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে বায়ু দূষণের ফলে সাড়ে ৮ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। এই হার ক্রমেই বাড়ছে।

এদিকে গত বছরে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের বাসিন্দারা বায়ুদূষণের প্রধান শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, পিএম ২.৫-এর নিরাপদ কিংবা সহনীয় মাত্রা এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায়নি। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজেই শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ ও হৃদ্রোগের পরিমাণ বাড়ায়। পিএম ২.৫-এর কারণে অ্যাজমা ও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রভাবশালী চিকিৎসা জার্নাল ল্যানসেট জুন,২০১৬ সালের প্রতিবেদনে ১৮৮ টি দেশের ২৩ বছরের (১৯৯০-২০১৩)তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে, নম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বায়ুদূষণ স্ট্রোকের বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আতংকজনক তথ্য উঠে এসেছে এবার প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭ নামক প্রতিবেদনে যা গত ১৫ ফেব্রæয়ারি সারাবিশ্বব্যাপী একযোগে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ নামক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ু দূষণের কারণে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ১লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের ক্রমমাত্রায় আমাদের ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম অবস্থানে আছে দিল্লী। এ প্রতিবেদন বলছে গত ২৫ বছরে (১৯৯০-২০১৫) বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে যদিও চীন এ তালিকায় আগে প্রথম অবস্থানে ছিলো। আমাদের ঢাকার বাতাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর পদার্থ পি এম২.৫ এর মাত্রা অনেক বেশি।
এবার দেখা যাক, পিএম২.৫ কি জিনিস? পিএম২.৫ হচ্ছে এমন এক ধরনের কঠিন বা জলীয় অতি সূক্ষকণা যা আড়াই মাইক্রোন বা তার নিচে চওড়া। মনে রাখা দরকার যে, এক ইঞ্চি সমান ২৫০০০ মাইক্রোন। যদি উদাহরণ হিসেবে বলি তাহলে বলা যায়, এ কণা একটা চুল যতটা চওড়া তার ত্রিশ ভাগের এক ভাগ সমপরিমান চওড়া। ফলে এটা এমন সূক্ষকণা যা খালি চোখে দেখা যায় না।
এ সূক্ষকণা দ্বারা আমরা কিভাবে ক্ষতিগস্ত হবো? উত্তর হচ্ছে, এ কণাগুলো এত সূক্ষ যে খুব সহজেই প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে হার্ট হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ যেমন হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে পানি পড়া থেকে শুরু করে এমন ছোটখাট অসুখ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসসহ হার্ট অ্যাটাক এবং ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা(IARC) পিএম২.৫ কে ‘জি-১ কার্সিনোজেন ‘ এর তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এ কণা মানদেহের ক্যান্সার সৃষ্টিতে একদম প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। তাছাড়া, বৃদ্ধ এবং বাচ্চাদের জন্য এ কণা আরো বেশি ক্ষতিকর। বাতাসে পিএম২.৫ এর স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য মাত্রা কত সেটা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। ফলে বাতাসে এর গ্রহণযোগ্য মাত্রার ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য কোন নির্দিষ্ট পরিমাপক নেই। আমেরিকার পরিবেশ রক্ষাবিষয়ক সংস্থা (EPA) ২০০৬ সালে বলেছে, স্বল্পমেয়াদে বাতাসে এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা হতে পারে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম। কিন্তু যদি দীর্ঘমেয়াদী বায়ু দূষণ হয় তাহলে এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে হবে মাত্র ১৫ মাইক্রোগ্রাম।
যদিও ২০১৩ সালে ইউরোপীয় দেশগুলোতে পরিচালিত তিন লাখ বারো হাজার নয়শ চুয়াল্লিশ জন মানুষের উপর গবেষণার যে ফল প্রকাশিত হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে যে, মানবদেহে এসব সূক্ষকণার কোন গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই। বরং সেখানে বলা হয়েছে প্রতি ঘনমিটারে যদি সুক্ষ কণার(পিএম১০) পরিমাণ ১০ মাইক্রোগ্রাম হয় তাহলে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি ২২ শতাংশ বেড়ে যায়। আর সূক্ষকণা যদি পিএম ২.৫ হয় ( অর্থাৎ বেশি সূক্ষ কণা) সেক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যান্সারের হার বেড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছে এবং মারাত্মক মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি করে।

শ্বাস-প্রশ্বাস ও সালোকসংশ্লেষণের জন্য ব্যবহৃত বায়ুমন্ডলীয় গ্যাসসমূহের প্রদত্ত প্রচলিত নাম বায়ু বা বাতাস। বায়ুদূষণ (Air Pollution) প্রাকৃতিকভাবে অথবা মানুষের কর্মকান্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থের দ্বারা বায়ুুমন্ডলের দূষণ। বায়ুদূষণের প্রধান উৎসসমূহ হচ্ছে গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া, শিল্পকারখানা এবং কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া। বায়ুদূষণের আরও একটি কারণ অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ঊর্ধ্বে বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তরে ক্রমবর্ধমান ফাটল সৃষ্টি হওয়া। মানবজাতি, উদ্ভিদরাজি, পশুপাখি এবং জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর অ্যাসিড বৃষ্টি সংঘটনের মাধ্যমেও বায়ুুদূষণ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে আসছে।

সৃষ্টির আদি লগ্নে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য ছিল। প্রকৃতি ও পরিবেশের মাঝেই বিচিত্র জীবনের বিকাশ ঘটে। অনেক সময় পরিবেশতগ কারণেই মানুষ ভাল-মন্দ হয়। পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন শান্তিময় সুস্থ পরিবেশ। বেঁচে থাকার জন্য যে পরিবেশের প্রয়োজন, সে পরিবেশ নানা কারনে জটিল আকার ধারন করেছে। মানুষ তার আবিষ্কারের প্রতিভা, পরিশ্রম আর দক্ষতা নিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা পদ্ধতি সংগ্রহ করেছে। বিজ্ঞান ক্রমবিকাশের ধারায় চরম উন্নতি লাভ করেছে। কিন্তু সেই মানুষ একইসঙ্গে পৃথিবীর সুন্দর পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, শহরগুলো ক্রমেই গাছ শূণ্য হওয়ায় বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়ছে। কাজেই শহরাঞ্চলে এই ক্ষতি এড়াতে বৃক্ষরোপনের প্রতি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা টিএনসি (The Nature Conservancy)এর একদল গবেষক সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রতিটি শহরে শীসার পরিমাণ ৭ থেকে ২৪ ভাগ কমাতে পারলেই মানুষ মুক্ত বায়ুতে শ্বাস নিতে পারবে। গবেষকদলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যন্ত এলাকায় গাছের পরিমাণ বেশি থাকায় সেখানকার মানুষের স্বাস্থ্য শহরাঞ্চলের তুলনায় অনেক ভালো। গড় আয়ু অনেক বেশি। এর মূল কারণ হল, নির্মল বাতাসে তারা শ্বাস নিতে পারেন। এছাড়া সেসব অঞ্চলের তাপমাত্রাও শহরাঞ্চলের তুলনায় অনেক কম।

গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক রব ম্যাকডোনাল জানান, যেসব শহরে এরইমধ্যে গাছের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে সেখানে দূষণের মাত্রাও অনেক কমে এসেছে। সেখানকার কয়েক কোটি মানুষ এর সুফল পাচ্ছেন। ম্যাকডোনাল জানান, বিশ্বের অন্তত আড়াইশ’ শহর পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখেছেন, বায়ু দূষণ ও শহরের তাপমাত্রা কমাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় না করে শুধু বৃক্ষরোপনের মাধ্যমেই পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তার মতে, বৃক্ষরোপনই বায়ু দূষণ রোধের একমাত্র কার্যকর উপায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বের প্রায় সবগুলো শহরই বায়ু দূষণ রোধে সংস্থার বেঁধে দেয়া নীতিমালা অমান্য করছে। ফলে স্বাস্থ্য ও প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে। তাদের মতে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। যেমন আমাদের বাংলাদেশ।

জার্মানির অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাঙ্ক প্লাাঙ্ক-এর একটি পরিসংখ্যান বলছে, চীনে বায়ু দূষণের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়৷ ফসলের ক্ষতি, বিমান ও গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মতো আরো কিছু ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে৷

বেইজিং এবং সাংহাইয়ের মতো শহরে ধোঁয়াশা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, শহরের বাসিন্দারা এখন ২০ ডলার করে অক্সিজেন বোতল আমদানি করা শুরু করেছেন৷ ক্যানাডিয়ান উৎপাদনকারীরা বলছে এক লিটার অক্সিজেন দিয়ে কম-বেশি ১৫০ বার নিঃশ্বাস নেয়া যায়৷

চীনের বেইজিং এর বাসিন্দা লি থানকিনের তিনবছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। মেয়ের জন্য কিছুটা ভালো বাতাস যোগাড় করতেই তিনি ক্যানে করে কানাডার রকি পর্বতের পরিষ্কার বাতাস কিনেছেন। দুষিত বাতাসের কারণে বেইজিংয়ে এখন ‘রেড অ্যালার্ট’। আর এই বাতাস থেকে বাচতে লি থানকিনের মতো বেইজিংয়ের অনেক বাসিন্দা এখন নিজের আর পরিবারের সদস্যদের জন্য কানাডার রকি পর্বতের মুক্ত বাতাস কিনছে। তাদেরই একজন লি থানকিন।

লি থানকিন বলছেন, কানাডার দুজন তরুণ ক্যানে করে এই বাতাস এনে বিক্রি করতে শুরু করে। সন্তানকে কিছুটা পরিষ্কার বাতাস দেয়ার জন্যই তাদের কাছ থেকেই তিনি ক্যান কিনে আনেন। ক্যানটির মুখে বাতাস নেয়ার জন্য একটি রাবারের ঢাকনি রয়েছে। সেটি খুলে সেখানে মুখ লাগালেই বাতাস নেয়া যায়। মিজ থানকিন বলছেন, এর মাধ্যমে আমার মেয়েকে রকি মাউন্টেনের পরিষ্কার বাতাস দিতে পারছি। কারণ আমার সন্তানের জন্য আমি সবকিছুই করতে পারি।

তবে এটা সমস্যার কোন সমাধান বলে মনে করেন না লি থানকিন। কারণ সারাক্ষণ বেইজিংয়ের বাতাসে থাকতে থাকতে মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তিনি নিজেও অসুস্থ বোধ করছেন। ‘রেড এলার্ট’-এর সময় ঘরের বাইরে বের হতেও তাদের সাহস হয় না।

ভারতেও বাতাস বিক্রি হবে-এ কথা শোনা যায়। আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, ভারতে এখন প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে। তবে পকেটে মোটা অঙ্কের টাকা থাকতে হবে। এখন থেকে ভারতে বোতলবন্দি টাটকা বাতাসের জোগান দেবে কানাডার একটি কম্পানি। বর্তমানে চীনে ‘টাটকা’ বাতাসের জোগান দিচ্ছে তারা। ভায়টালিটি এয়ার নামের কম্পানিটি ভারতে বোতলবন্দি বাতাস বিক্রি করতে একেবারে প্রস্তত। তিন লিটার একটি বোতলের দাম পড়বে ৭২৫ রুপি। আর আট কেজি বাতাসের দাম এক হাজার ৪০০ রুপি। গত বছর চীনে বোতলবন্দি বাতাস বিক্রি করতে গিয়ে হইচই ফেলে দেয় কম্পানিটি। এমনকি মোটা অঙ্কের মুনাফাও হয় তাদের। ভায়টালিটি এয়ারের প্রতিষ্ঠাতা মসেস ল্যাম একটি সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, ‘ভারতে বায়ুদূষণ চীনের চেয়ে কম নয়। আশা করছি সেখানে আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি হবে।’

ভাইটালিটি এয়ার এখন শুধু চীন না, ভারত, কোরীয়া এবং ভিয়েতনামেও ব্যবসা চালাচ্ছে৷ দুই সপ্তাহ পরপর ২০ জন কর্মী কানাডার রকি মাউন্টেইন থেকে কয়েক লাখ লিটার বাতাস সংগ্রহ করেন৷ ‘‘বানফ ন্যাশনাল পার্ক থেকে সংগ্রহ করা বাতাস এখন বিক্রির শীর্ষে”, বলেন মোজেস লাম৷
বিশুদ্ধ বাতাস উৎপাদন বেশ জটিল৷ সংগৃহীত বাতাসের মাত্র ২০ ভাগ থাকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন৷ ফলে বাতাসকে শোধন ও সংকুচিত করে বোতলে ঢোকাতে হয়৷ মূল্যবান এই পণ্যের স্থায়ীত্বও খুব কম৷ লাম বলছেন, ‘‘এক থেকে দু’বছরের মধ্যে এই বোতল ব্যবহার করে ফেলা উচিত৷”
নিজের সাফল্যে চমৎকৃত কানাডার এডমন্টনের ভাইটালিটি এয়ারের সহপ্রতিষ্ঠাতা মোজেস লাম৷ টেলিভিশন চ্যানেল সিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, পুরোটাই শুরু হয়েছিল একটা রসিকতার অংশ হিসেবে৷ কিন্তু প্রথম উৎপাদনের ১০০ বোতল যখন চার দিনেই শেষ হয়ে যায়, তখন তিনি বিষয়টাকে পেশাগত রূপ দেয়া শুরু করেন৷

সিডনির গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন ২০১৫ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার বাতাস সরবরাহ করছে৷ বোল্ড মাউন্টেন, গোল্ড কোস্ট, এমনকি গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের বাতাসও বিক্রি করে এই কোম্পানি৷ তবে অর্ডার করতে হবে ন্যূনতম চার হাজার বোতল৷ প্রতি বছরই লাখ লাখ ডলার আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি৷ কোম্পানির ক্রেতারা বেশিরভাগই আসছেন এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে৷বায়ুদূষণ রোধে গাড়ি উৎপাদক এবং বিভিন্ন শহর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কোনো কাজে না আসায় জার্মানিকেও ভবিষ্যত বাজার হিসেবে দেখছে গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন৷
বৃটেনের দি ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার প্রতিবেদন মতে, বার্লিনের মাঙ্ক ডেলব্র্যুক সেন্টার ফর মলিকিউলার মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন নেকেড মোল ইঁদুর তাদের মাটির তলার গর্তে খুব অল্প অক্সিজেন নিয়ে দিনের পর দিন বাঁচতে পারে৷ পরীক্ষাগারে এরা শেকড় থেকে ফ্রুকটোজ শুষে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা টিকে ছিল৷ যেখানে স্বাভাবিক নাড়ির স্বাভাবিক গতি মিনিটে ২০০ বার, সেখানে এই ইঁদুর নাড়ি মিনিটে ৫০-এ নামিয়ে আনতে পারে৷এই আবিষ্কার কীভাবে মানুষের জীবনে কাজে লাগানো যায়, তা বের করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা৷ তবে তার সফল বাস্তবায়ন অনেক দূরে।

এরই মাঝে শুধু কানাডার কোম্পানি নয়, দূষণকে পুঁজি করে বাণিজ্য করছে চীনের একটি রেস্তোরাঁও। চীনের ঝাংজিয়াং শহরে রেস্তোঁরাটি বাতাস বিশুদ্ধকরণের মেশিন লাগিয়ে খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে! এভাবে আরো বেশি হারে কখনো খাবার হোটেলে, কখনো ফেরি করে বিক্রি হবে বাতাস, তারপরও সচেতন হব না আমরা! দূষণের ষোলআনা পূরণ হলে এটি কি আর বাসযোগ্য পৃথিবী থাকবে?

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।