রাউজান নিউজ

বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তীর্থস্থান বটবৃক্ষ

এস.এম মুজিব (রাউজান নিউজ)ঃ

বটগাছ আমাদের গর্বের ধন।কারণ এমন একটি বিশাল আয়তনের ছায়াবৃক্ষের জন্মস্থান এই বঙ্গভূমি। আমরা যখন কোনো দূরের দেশে গিয়ে একটি বটগাছ দেখি এবং তার বৈজ্ঞানিক নামের শেষাংশে যখন বেঙ্গহালেনসিস শব্দটা দেখতে পাই, তখন নিশ্চয় অন্য রকম ভালোলাগা অনুভূতি তৈরি হয়। তা ছাড়া বট এই অঞ্চলের আদিতম বৃক্ষ। আবহমানকাল ধরেই বটবৃক্ষ আমাদের নানামাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। বটবৃক্ষের ছায়া-মায়ার সঙ্গে মিশে আছে আমাদের প্রাণ ও প্রকৃতির গল্প, সংস্কৃতির আদি-অন্ত, হাটবাজার, অর্থনীতি এবং নানা উপচারের কাহিনী।বটবৃক্ষ আমাদের তীর্থস্থান, আমাদের সংস্কৃতির আদি উৎস। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বটপরিবারের সব গাছকে বটগাছ নামে চিনলেও আদতে এরা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির। আকৃতি, গড়ন ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এরা অনেকটাই আলাদা, আমাদের সংস্কৃতির চিরসখা এসব বটবৃক্ষের কিছু উল্লেখ্যযোগ্য প্রজাতি সম্পর্কে জানা যাক- আমাদের দেশে বটপরিবারের বেশ কিছু গাছ দেখা যায়। তার মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা ৮-১০ রকমের বটগাছ ও আছে।নতুন পুরনো মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশের কাছাকাছি।খুব সহজেই যেন আমরা তাদের চিনতে পারি সেই জন্য তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা নাম আছে।

কিন্তু সার্বিকভাবে আমরা এ ধরণের সব গাছকে বটগাছ নামেই ডাকি। বংশবৃদ্ধির কৌশলেও এরা অভিন্ন। উপগাছা হিসাবেও বটের খ্যাতি আছে। উপযুক্ত পরিবেশে একটি বটগাছ ৫০০ থেকে ৬০০ বছর বেঁচে থাকতে পারে। অন্যান্য বৃক্ষের মত বটগাছও আমাদের বন্ধু। বটগাছ নিজেই একটা ইকোসিস্টেম। বটগাছের উপর নির্ভরশীল অনেক প্রাণী-পতঙ্গ ও পাখি। বটের সব আয়োজন মানুষের কল্যানে নিবেদিত। যে বৃক্ষটি আমাদের এত কল্যাণ সাধন করছে,ছায়া-মায়া ও অক্সিজেন সরবরাহ করছে প্রতিনিয়ত,তার সম্পর্কে কতটুকু জানি।খুব বেশী কিছু মনে হয় জানি না।তাহলে শোনা যাক তাদের সম্পর্কে দু-চারটি কথা।বটগাছ চিনতে প্রায়ই আমাদের একটা ঝামেলায় পড়তে হয়। কোনটা বট, কোনটা অশ্বথ, কোনটা পাকুড়? সাধারণভাবে স্বভাব ও আকৃতিতে এরা প্রায় একই রকম।তবে তিন প্রজাতির মধ্যে বটগাছ অনেকটা সহজেই চেনা যায়।সারা দেশে এরা সংখ্যায়ও বেশী। খুব অল্প বয়স থেকে ঝুরি নামতে শুরু করে।মাটির সমান্তরালে বাড়তে থাকা ডালপালার ঝুরিগুলো একসময় মাটিতে গেঁথে নিজেরাই একেকটা কাণ্ডে পরিণত হয়। এভাবেই বটগাছ ধীরে ধীরে চারপাশে বাড়তে থাকে এবং একসময় মহীরুহে পরিণত হয়।বটের পাতা ডিম্বাকৃতি(আগা গোলাকার,একান্তর,মসৃণ ও উজ্জল সবুজ। কচি পাতা তামাটে।স্থান-কাল-পাত্রভেদে পাতার আয়তনের বিভিন্নতা একাধারে বটের বৈশিষ্ট্য তথা প্রজাতি শনাক্তকরণের পক্ষে জটিলতার কারণও।পরিণত গাছের পাতা আকারে কিছুটা ছোট হয়ে আসে।বটের কুঁড়ি পাঁশুটে হলুদ এবং এর দুটি স্বল্পায়ু উপপত্র পাতা গজানোর পরই ঝরে পড়ে। বসন্ত-শরৎ বটের নতুন পাতার দিন,কচি পাতার উজ্জ্বল সবুজে আচ্ছন্ন বটগাছ বেশ সুশ্রী।গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত ফল পাকার দিন।এই ফল কাক,শালিক ও বাঁদুরের প্রিয়।

বটের উপকারিতা বিবিধ।এর কষ থেকে নিকৃষ্ট ধরণের রাবার উৎপন্ন হয়,বাকলের আঁশ দড়ি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার্য।পাতা কুষ্ঠরোগে উপকারী।ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বটগাছ কাটা নিষিদ্ধ।ভারতের জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা পেয়েছে বটগাছ।বটের বৈজ্ঞানিক নাম Ficus benghlensis। অশ্বথ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বৃক্ষ।কারণ গৌতম বুদ্ধ এই বৃক্ষের নিচে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন।এই কারণে গাছটির আরেক নাম বোধিদ্রুম।অশ্বথ বটের মতোই বিরাট।কাণ্ড নাতিদীর্ঘ,শাখা বিশাল,শীর্ষ ছত্রাকৃতি এবং বাকলের রং ধূসর,শরীর প্রায় মসৃণ আর কাণ্ডের সদ্যমোচিত বাকলের জায়গা রক্তিম।এদের ঝুরির সংখ্যা খুবই কম,শাখা মাটির সমান্তরালে প্রসারিত।অশ্বথের পাতা কিন্তু বটের চেয়ে একেবারে আলাদা।শুধু একটি বিশেষ দিক থেকেই এই পাতা শনাক্ত করা সম্ভব।এমন তাম্বুলাকৃতি ঘন সবুজ পাতার লম্বা লেজ অন্য গাছে নেই। গ্রীষ্মকালে কোনো অশ্বথের নিচে দাঁড়ালে এ কারণেই শন শন বা শো শো শব্দ শোনা যায়।মূলত পাতার লেজের সঙ্গে ফলকের ঠোকাঠুকির কারনেই এমন শব্দ হয়।বসন্তের শেষেই সব পাতা ঝরে পড়ে।নতুন পাতার রং তামাটে।এ কারণে কচি পাতায় রক্তিম অশ্বথ অত্যন্ত মনোহর।বর্ষার শেষ দিকে ফল পাকে।কচি ফল সবুজ,পাকা ফল গাঢ় বেগুনী।দীর্ঘায়ু হিসেবে এ গাছের খ্যাতি আছে।কথিত আছে যে ২৮৮ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীলংকায় রোপিত গাছটি আজও বেঁচে আছে এবং এর পরিধি ক্রমেই বাড়ছে।কাঠ মূল্যহীন হলেও প্রতিটি অংশই ভেষজগুণসম্পন্ন।ঢাকায় বেশ কিছু অশ্বথগাছ চোখে পড়ে।

রমনা বটমূলে বটগাছ হিসেবে খ্যাত গাছটি বটগাছ নয়,অশ্বথ।বৈজ্ঞানিক নাম Ficus religiosa।বট-অশ্বথ তো চেনা হলো,এবার পাকুড়ের কথা বলি।পাকুড় আকার প্রকারে অনেক টা বটের মতোই,ঝুরিবহুল,বিস্তৃত ও বিশাল।কিন্তু পাতা দেখতে অনেকটা অশ্বথের মতো।তবে চওড়ায় কম ও লম্বা একটু বেশী।বসন্ত শেষে অশ্বথের মতো এদের পাতাও ঝরে যায় ।আর চৈত্রে রক্তিম উজ্জ্বল বা তামাটে রঙের পাতা গজায়।পাতাগুলো পরে ধীরে ধীরে গাঢ় সবুজে পরিণত হয়।কাজেই পাকুড়কে অশ্বথ বলে বিভ্রান্তি হতে পারে।পাকুড়ের ছাল সাধারণত অর্ধ ইঞ্চি পুরু, সবুজ আভাযুক্ত, ধূসর বর্ণ ও মসৃণ।কাঠও ধূসর রঙের।বর্ষার শেষভাগে কমলা রঙের ফলগুলো পাকে।এ প্রজাতির মধ্যে বেশ কয়েকটা জাত আছে।পাকুড়ের ছাল ও পাতা নানান রোগে ব্যবহার্য।পাতার রাসায়নিক দ্রব্যে প্রচুর পরিমাণ জটিল প্রোটিন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।এ গাছকে ক্ষীরী বৃক্ষও বলা হয়।কারণ এর কচি ডাল ও পাতা ছিঁড়লে সাদা আঠা বের হয়।জানামতে,ঢাকায় কোনো বড় পাকুড় নেই।পাকুড় বেশী হয় গ্রামাঞ্চলে।ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার পারিল গ্রামে একটি বড় পাকুড় আছে।এ গাছের নিচে প্রতি বছর পৌষসংক্রান্তির মেলা হয়।পাকুড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Ficus infectoria ।ফাইকাস কমোসা নামের আরেকটি বটগাছ আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।এদের ইংরেজি নাম জাভা ফিগ।বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় এ গাছ বেশী দেখা যায়।সবচেয়ে বেশী দেখা যায় খাগড়াছড়ি জেলায়।