রাউজান নিউজ

একাত্তরের অগ্নিঝড়া মার্চের শহীদ স্বজনদের স্মৃতি খুজে দামপাড়ায় এক বীরযোদ্ধা তৈয়ব তালুকদার

মীর আসলাম (রাউজান নিউজ)ঃ
বয়সের ভারে এখন প্রায় হাঁটাচলায় অক্ষম। তবুও অতীত স্মৃতির টানে তিনি প্রতিবছর মার্চ মাসে ছুটে আসেন দামপাড়ায় পুলিশ লাইনে। যেখানে তার অনেক সহকর্মী বীরযোদ্ধা ৭১ সালে ২৬ মার্চ শহীদ হয়েছিলেন পাকহানাদার বাহিনীর হাতে। নিজের হাতে থাকা থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি শেষ হলে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে জীবন রক্ষা পাওয়া এই বীরমুক্তিযোদ্ধার নাম তৈয়ব তালুকদার। তিনি পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য। সাহসী স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক এই লোকটির বাড়ী রাউজান গশ্চি গ্রামের মোহাম্মদ জামান তালুকদার বাড়ীতে। এই বাড়ীর মরহুম আবু মিয়া তালুকদারের ছয় পুত্রের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় পুত্র। প্রথম পুত্র শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর-রশিদ তালুকদার তৎকালিন ইবিআর এর সৈনিক। ১৯৭১ এর যখন যুদ্ধের ঘনঘটা তখন হারুন-অর-রশিদ তালুকদার ছিলেন খুলনার নিউজ প্রিন্ট মিলে দায়িত্বরত। ওই সময় পাকিস্তানী বাহিনীর কমাণ্ড অগ্রাহ্য করে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিতে গেলে পাকিস্তানীদের হাতে সেখানকার অন্যান্য বাঙালী সৈনিকদের সাথে শহীদ হয়েছিলেন ২৭ মার্চ। তার নাম শহীদ যোদ্ধার তালিকায় স্থান পেয়েছে। ছোট ভাই তৈয়ব তালুকদার পুলিশ (কনেষ্টবল নং-৪৯৪) ছিলেন রাঙ্গামাটিতে দায়িত্বরত অবস্থায়।

বীরমুক্তিযোদ্ধা তৈয়ব তালুকদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তৎকালিন রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক এইচ.টি ইমাম (যিনি বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) ও জেলার পুলিশ সুপার বজলুর রহমানের নিদেশনা পেয়ে ওই দিন সকাল ১০টায় রাঙ্গামাটি পুলিশ লাইনের অন্যান্য সদস্যদের সাথে এসেছিলেন চট্টগ্রাম দামপাড়া পুলিশ লাইনে। তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল অরক্ষিত পুলিশ লাইনকে পাকবাহিনী যেকোন আক্রমন থেকে রক্ষা করতে।

রাঙ্গামিটি পুলিশ লাইন থেকে ২৫ জন কনেষ্টবল ২ জন নায়েকসহ যে ১ প্লাটুন ফোর্স দামপাড়ায় এসেছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন হাবিলদার এখলাস মিয়া। ওই সময় একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ৪০ রাউন্ড গুলি দিয়ে তাদেরকে পাঠানো হয়েছিল। একটি রিজার্ভ রাউন্ড বক্সে দেয়া হয়েছিল ৭৫০ রাউণ্ড গুলি।

জানা যায়, পুলিশ দলটি রাঙ্গামাটি থেকে দামপাড়ায় পাঠানোর জন্য নির্দেশনায় ছিলেন ১নং সেক্টরের কমান্ডা মেজর রফিক। এই পুলিশ দলের সাথে থাকা বীরযোদ্ধার মতে ২৬ মার্চ বিকালে দামপাড়া পুলিশ লাইনে এসে আমরা আর.আই শহীদ আকরাম হোসেন এর নিকট রিপোর্ট করি। তৎকালিন চট্টগ্রামের এস.পি ছিলন শহীদ সামছুল হক (পি.এস.পি)। তারা আমাদের অবস্থান ও করনীয় কি হবে তা জানিয়ে দেন। আমরাও সেভাবে প্রস্তুতি নিই। আরা.আই এর পরামর্শে আমিসহ ৮ জনকে দামপাড়ার ১নং গেইটের প্রতিরক্ষা কাজে মোতায়েন করে। সেখানে পূর্বে থেকে থাকা চট্টগ্রামের সুবেদার আব্দুল মালেক সহ আরো ৮জন বাঙ্গালী পুলিশ অবস্থান করছিল। আমারা তাদের সাথে যোগ দিয়ে ১নং গেইতে রিজাভ অফিসে অবস্থান করছিলাম। এরবাইরে আমাদের প্লাটুনে অন্যান্য সদস্যরা ২নং ও ৩নং গেইট অবস্থান নিয়েছিলেন।

আমাদের কাছে খবর আসতে থাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রাম আক্রমন করতে পারে। সেই আলামত আমরা পাই ২৭ ও ২৮ মার্চ রাতে থেমে থেমে গুলি বর্ষণ থেকে। সেই অবস্থার মধ্যে আমরা সরারাত নির্ঘুম রাত কাটাই অস্ত্র পজিশন নিয়ে। বিভিন্ন সূত্রে খবর আসে সার্কেট হাউজে বাঙালী ইপিআর সৈন্যরা অবস্থান করছে। যারা আমাদেরকে দুর্যোগ কালিন সময় সাহায্য করবে।

অথচ খবরটি ছিল পুরো উল্টো। বাঙ্গালীদের ধোকা দেওয়ার জন্য ইপিআর এর পোশাক পরিহিত অবস্থায় রাতের আধারে পাকিস্তানী সৈন্যরা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সার্কিট হাউজে উঠে যায়। ২৯ মার্চ ভোর হতে না হতেই সার্কেট হাউজ থেকে অতর্কিত মোটর সেলিং হামলা শুরু হয় আমাদের উপর। হামলাকারীরা গুলি ছুঁড়ছিল দামপাড়া পুলিশ লাইন লক্ষ্য করে। আমরা যেহেতু এক নং গেইটে কাছে অবস্থান করছিলাম, সেহেতু পরিস্কার ভাবে বিষয়টি বুঝতে পাচ্ছিলাম।

আমাদের পুলিশ সুপার শহীদ সামছুল হক সহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা তখন পাকবাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। তারা আমাদেরকে নিদেশনা দিচ্ছিলেন। হানাদার বাহিনী দামপাড়া দিকে এগুতে দেখে আমার ধরে নিয়েছিলাম তারা আমাদের উপর আক্রমন করতে আসছে। তাদের ড্রেস দেখে চিনার উপায় ছিলনা তারা বাঙালী না পাকিস্তানি।

ভারি অস্ত্র চালানো দেখে আমরা বুঝে নিলাম এরা প্রশিক্ষিত পাক বাহিনী। দেরী না করে সঙ্গে সঙ্গে থ্রি নট থ্রি রাইফের দিয়ে গুলি চালানো শুরু করেছিলাম আমরা। আমি প্রথম থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি ছোঁড়ার পর সাথে থাকা সহযোদ্ধারাও গুলি ছুড়তে থাকে। প্রথম দিকে পাল্টা গুলো বর্ষণ দেখে তারা কিছুটা থমকে যায়। পরবর্তীতে একনাগারে তাদের ভারী অস্ত্রের মুখে আমরা কোণঠাসা হয়ে পড়ি। এরই মধ্যে শহীদ হন আমার সাথে থাকা সুবেদার আবদুল মালেক, কনেষ্টবল আবদুল জলিলসহ আরো অনেকেই।

আমার রাইফেল এর ৪০টি গুলি শেষ হলে, এখালছ হাবিলদার আগেই আমাকে হুসিয়ারী করে অত্মরক্ষার জন্য স্থানত্যাগের। আমি একটি হাফপেন্ট পরে লাফ দিয়ে পাহাড়ের নিচের দিকে নেমে আসি। অপরদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা পুরো দামপাড়া দখলে নিয়ে। আমার সঙ্গীদের মধ্যে অন্যরা কে কোন পথে গেছে দেখার সুযোগ হয়নি। শুধু নজরে এসেছে দুই জন একটি নালায় শুয়ে পড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টায় ছিল।

আমি পুলিশ লাইনের পার্শ্বে নিচের একটি ঘরের পানি হাউজের মধ্যে ডুকে উপরে টিন দিয়ে ডেকে বসে ছিলাম। পাকিস্তানিরা পুরো এলাকা তল্লাশী চালিয়ে বাঙালীদের গালাগাল করে চলে যায়। এরই মধ্যে সন্ধ্যায় মাইকে কার্পফিউ শিথিলে ঘোষনা শুনে আমি বিহারী কলনীর পাশ দিয়ে হেটে রাস্তা পাড় হয়ে চট্টশ্বরী রোড দিয়ে চকবাজারে আসি। পরে জানতে পারি দামপাড়ায় পাকিস্তানীদের ঐ আক্রমন অনেক বাঙালী পুলিশ শহীদ হয়েছে। হানাদার বাহিনী তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে আমি চলে যাই রাঙ্গামাটিতে। মুক্তিযুদ্ধকালিন সময় রাঙ্গামাটিতে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারত যাওয়া আসায় সর্বাত্বক সহযোগিতা করি। রাউজান থানার যুদ্ধকালিন কমান্ডার গিয়াস উদ্দীন কেদারের সাথে সমন্বয় রেখে গেরিলা যোদ্ধাদের কলাকৌশল ও নিদেশনা দিয়ে সহায়তা করি।