রাউজান নিউজ

রাউজানের মহামুনি এ্যাংলো পালি স্কুল

যেখানে শিক্ষকতা করেছেন ড.বেনী মাধব বড়ুয়া

আশে পাশে বাড়ী ঘর তেমন নেই। নিরিবিলি পরিবেশ। সামনের খাল পাড়ের রাস্তার পাশ ঘেঁষে সীমানা প্রচীরের অভ্যন্তরে নানা প্রজাতির সারি সারি বৃক্ষের সাথে বিশাল অঙ্গন জুড়ে মৌসুমে লাল ফুলে ভরা থাকে কৃষ্ণ চুড়া গাছের ঢাল পালা। গাছের ছায়ায় একাধিক পাকা দালান। সামনে গ্রীল দিয়ে ঘেরা ফুলের বাগান। ভিতরে মানুষের চারটি ম্যুরেল (মুর্তি)। এসব ম্যুরেল তৈরী করেছেন স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাদের শ্রদ্ধা নিবেদনে। দালানে সুসজ্জিত প্রায় সব কক্ষে বসে পাঠ নিচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠ দিচ্ছেন আধুনিক মাল্টিমিডিয়া পদ্ধতিতে। সুন্দর প্রাকৃতিক এই পরিবেশ দক্ষিণ রাউজানের অন্যতম প্রাচীণ বিদ্যাপীঠ মুহামনী এ্যাংলো পালি হাই স্কুল। ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রচীণ স্কুলটিতে এক সময় শিক্ষকতা করেছিলেন মুহামনি গ্রামের কবিরাজ রাজচন্দ্র তালুকদার ও ধনেশ্বরী তালুকদারের আলোকিত সন্তান বেনী মাধব বড়–য়া। যিনি পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে ল-ন ইউনিভারসিটি থেকে ডি-লিট ডিগ্রী পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তখন এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসাবে।
এ্যংলো পালি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার পেক্ষাপট নিয়ে আলোচনায় এলাকার প্রবীণরা বলেছে সেকাল থেকে পাহাড়তলী ইউনিয়নের মহামুনি গ্রামটি আধিবাসী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের জন্য তীর্থ ভূমি। ১৮’শ শতাব্দিতে এই গ্রামের এক বৌদ্ধ ভিক্ষু চাইঙ্গা ঠাকুর বিশেষায়িত একটি বৌদ্ধ মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর গ্রামটি মহামুনি হিসাবে স্বীকৃত হয়। এর আগে গ্রামটি কদলপুর এর অংশ হিসাবে পরিচিতি ছিল। চাইঙ্গা ঠাকুরের বৌদ্ধ মূর্তির প্রভাবে এখানে ব্যাপক হারে আসা যাওয়া শুরু হয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির। বিশেষ করে পার্ব্বত্য অঞ্চলের তৎকালীন রাজাসহ রাজ দরবারের লোকজনের অন্যরকম ভক্তি,শ্রদ্ধা ছিল এই মহামুনির প্রতি। কালের পরিক্রমায় এই মহামুনি বিশ্ব বৌদ্ধদের তীর্থ ভূমিতে পরিণত হয়। গ্রামবাসীর মতে তৎকালিন সময়ে গ্রামের হাতেগোনা যে কয়েকজন শিক্ষিত লোক ছিলেন তারাই গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহামুনি মডেল স্কুল নামে। পরবর্তীতে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এই এলাকার বৌদ্ধ সমাজের গোত্র ও কৃষ্টির সাথে মিল রেখে মহামুনি এ্যাংলো পালি হাই স্কুল। ইতিহাস থেকে জানা যায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান সর্বাধিক তাদের মধ্যে আছেন প্রয়াত গগন চন্দ্র বড়–য়া, দক্ষিণা রঞ্জন মুৎসুদ্দি, অধরলাল বড়–য়া, মোহন চন্দ্র বড়–য়া, হরগোবিন্দ মুৎসুদ্দি, জয়লাল বড়–য়া,সতীশ চন্দ্র বড়–য়া, বীরেন্দ্র লাল মুৎসুদ্দি, কালি কিঙ্কর মুৎসুদ্দি প্রমূখ। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় সামাজিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়তে হয়। তবে এসব দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষমও হয় গ্রামের মানেষের ঐক্যবদ্ধতার কারণে। প্রাচীণ এই স্কুলটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে এখানে দেশী বিদেশী বৌদ্ধ পর্যাটকদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ার পর থেকে। মহামুনি মন্দির দর্শনে আসা বিদেশীদের জন্য দর্শনীয় স্থান হয় এই স্কুলটিও। তারা বিভিন্ন সময় স্কুলটি পরিদর্শনে এসে শিক্ষার্থীদের সাথে বসে আড্ডায় বসেন, সকলের সাথে একেকার হয়ে সঙ্গীত চর্চা করেন, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতি উৎসাহ জোগান। স্কুলটির বিশেষ সমৃদ্ধি আসে গ্রামের শিক্ষানুরাগী লায়ন রূপম কিশোর বড়–য়া এটির অভিভাবকত্ব গ্রহনের পর থেকে। তার দিক নিদ্দেশনায় স্কুলটি পরিচালিত হলে এটি রাউজানের একটি মডেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সম্প্রতি এই স্কুলটিতে শেখ রাসেল কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যদিও বহু আগে থেকে এই স্কুলের সংযোজন করা হয়েছিল বেশ কয়েকটি কম্পিউটার। বর্তমানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৪ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারীসহ সাড়ে সাত’শ শিক্ষার্থী প্রতিদিন দুপুরের টিফিন পাচ্ছে। স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে এখানে বসানো হয়ে আধুনিক মানে পানি শোধনগার, রাখা হয়েছে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতি চর্চায় সব রকম সামগ্রী। স্কুলের প্রধান শিক্ষক অঞ্জন বড়–য়া আলোকিত গ্রাম মহামুনির সন্তান। সেদিক থেকে স্কুলটির প্রতি তার মমত্ববোধ অন্য রকম। তিনি বলেন এখানে ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ইংরেজি শিক্ষার উপর একটি টেনিং করা হয়। প্রতি মাসে তাদের প্রতিনিধি পাঠানো হয় একাজে। প্রতিটি শ্রেণিতে পাঠদান হয় মাল্টিমিডিয়া পদ্ধতিতে। এই স্কুলের শিক্ষক নাসরিন সুলতানা একজন মাল্টিমিডিয়া প্রশিক্ষিত টেইনার। শিক্ষক শেখর ঘোষ জানায় এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা গনিত অলিম্পিয়াডে নিয়মিত অংশ গ্রহণ করে থাকে। শিক্ষক প্রদীপ ভট্টচার্য্য বলেছেন স্কুলটির শিক্ষার পরিবেশ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাইতে আলাদা হওয়ায় প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফলও সন্তোষ জনক।
জানা যায় বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সভাপতি রূপম কিশোর বড়–য়া ব্যক্তিগত তহবিলের টাকায় পানি শোধনাগার, খেলাধুলার সরঞ্জামাদি দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের টিফিনের টাকার একটি অংশ দিয়ে থাকেন রূপম বড়–য়ার সাথে সরজিৎ বড়–য়া, এছাড়া রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীও স্কুলটির উন্নয়নের ভূমিকা রেখে চলেছেন।